
লক্ষ্মীপুরের সড়কগুলো কি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি? নাকি এসব সড়ক ১৮ লাখ মানুষের চলাচল, নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকার জন্য নির্মিত? যদি সড়ক হয় জনগণের সম্পদ, তাহলে মাত্র ১০০ পরিবারের রুটি-রুজির যুক্তিতে সেই সড়ক ধ্বংসের ঝুঁকি কেন বহন করবেন জেলার লাখ লাখ মানুষ? কেন ভারী ড্রাম ট্রাকের অবাধ বা অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে সড়ক নষ্ট হবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে এবং সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত জীবন হাতে নিয়ে চলাচল করতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব এখন লক্ষ্মীপুরবাসীর প্রাপ্য।
২০২৪ সালের শেষ দিকে লক্ষ্মীপুরে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় ড্রাম ট্রাক চলাচলসহ বিভিন্ন যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। সভায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, মালিক-শ্রমিক সংগঠন, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, ড্রাম ট্রাক নিয়ন্ত্রণ, সিএনজিচালকদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা, কৃষিকাজের জন্য ভর্তুকিতে আমদানি করা পাওয়ার টিলারের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং অটোরিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো উঠে আসে।
সভায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীরা ড্রাম ট্রাক চলাচলের বিরোধিতা করে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, লক্ষ্মীপুরের সড়কগুলোর ভারবহনক্ষমতা বিবেচনায় এসব ভারী যানবাহন চলাচল উপযোগী নয়। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলার সড়কগুলোর ভারবহনক্ষমতা যেখানে সর্বোচ্চ ৫৫ টন, সেখানে কোনো কোনো ড্রাম ট্রাক ৭০ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত বোঝা নিয়ে চলাচল করে। এমন অতিরিক্ত ভারে সড়কের স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক অল্প সময়ের মধ্যে নষ্ট হলে এর দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় রাষ্ট্রকে, আর ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে।
শুধু জেলা শহরের সড়ক নয়, গ্রামের সরু সড়কগুলোও ভারী ড্রাম ট্রাকের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পুকুর ভরাট, জমি ভরাট ও নির্মাণকাজে বালু পরিবহনের জন্য এসব ট্রাক ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ গ্রামীণ সড়কগুলো সাধারণত এত ভারী যানবাহনের চাপ সহ্য করার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয় না। ফলে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ জনপদের মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের চলাচল ও জরুরি সেবাপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কে পাওয়ার টিলারের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং অটোরিকশার বিশৃঙ্খলা। সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পরও কার্যকর সমাধান কোথায়?
সভায় ড্রাম ট্রাক মালিক সমিতির নেতারা দাবি করেন, এ খাতের সঙ্গে প্রায় ১০০টি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। তাঁদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ড্রাম ট্রাক চলাচলের সুযোগ রাখার দাবি জানানো হয়। তাঁদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওজন স্কেল স্থাপনের বিষয়টি সামনে রেখে নির্দিষ্ট সময়ে ড্রাম ট্রাক চলাচলের সুযোগ রাখা হয় বলে জানা যায়।
আমরা অস্বীকার করি না- কোনো পরিবারের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। ড্রাম ট্রাকের মালিক, চালক ও শ্রমিকদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার অন্য মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং জনসম্পদ ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়ানোর অবাধ অনুমতিপত্র হতে পারে না। জীবিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বিকল্প ও নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; জনস্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নয়।
এখানে মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পষ্ট: ১০০ পরিবারের জীবিকা রক্ষার জন্য যদি ড্রাম ট্রাক চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেই সুযোগের কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটলে দায় নেবে কে? ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্নির্মাণের অর্থ কোথা থেকে আসবে? দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের ক্ষতি কে পূরণ করবে? একটি পরিবারের উপার্জন রক্ষার যুক্তিতে অন্য একটি পরিবার যদি তার প্রিয়জনকে হারায়, সেই ক্ষতির মূল্য নির্ধারণ করবে কে?
মানুষের জীবন কোনো ব্যবসায়িক হিসাবের খাতায় লেখা সংখ্যা নয়। একটি প্রাণহানিও রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সেখানে লাখ লাখ মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকারকে উপেক্ষা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সভায় ওজন স্কেল স্থাপনের দাবি উঠেছিল। কারণ, একটি সড়কে কত ওজনের যানবাহন চলতে পারবে, তা অনুমান বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়- প্রকৌশলগত মূল্যায়ন ও নির্ভরযোগ্য পরিমাপের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওজন স্কেল স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে কি? হয়ে থাকলে তা কোথায়, কবে থেকে এবং কীভাবে কার্যকর রয়েছে? প্রতিটি ড্রাম ট্রাকের ওজন যাচাই করা হচ্ছে কি? অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত মালামাল বহন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।
ওজন স্কেল স্থাপনের পরিকল্পনা যদি কেবল সভার সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকে, আর বাস্তবে অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক সড়কে চলাচল করতে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের কোনো কার্যকারিতা নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্বের একটি অংশ; সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই প্রকৃত দায়িত্ব।
লক্ষ্মীপুরের সড়ক রক্ষা করতে হলে প্রথমেই প্রতিটি সড়কের প্রকৃত ভারবহনক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সেই সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যানবাহনের ওজন ও চলাচলের অনুমতি নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত বোঝাই ড্রাম ট্রাকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, কার্যকর ওজন পরিমাপ, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনরুদ্ধারের জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। যে সড়ক ভারী ড্রাম ট্রাক চলাচলের উপযোগী নয়, সেখানে কোনো যুক্তিতেই এসব যানবাহন চলতে দেওয়া উচিত নয়। আর যেখানে প্রকৌশলগতভাবে চলাচল অনুমোদনযোগ্য, সেখানে নির্ধারিত ওজন, সময়, রুট ও নিরাপত্তাবিধি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।
একই সঙ্গে ড্রাম ট্রাকের মালিক ও শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়টিও দায়িত্বশীলভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিকল্প রুট, উপযোগী যানবাহন, বৈধ পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে তাঁদের জীবিকা সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগের অর্থ কখনোই এই হতে পারে না যে, জনগণের সড়ক ধ্বংস হবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, আর প্রশাসন কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
আমরা মনে করি, লক্ষ্মীপুরের সড়ক রক্ষায় প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ড্রাম ট্রাকের পাশাপাশি অটোরিকশা, লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং গ্রামীণ সড়কে অনুপযোগী ভারী যান চলাচলের বিরুদ্ধেও সমানভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগে কোনো মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ যেন জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান না পায়।
সবচেয়ে বড় কথা, লক্ষ্মীপুরের সড়ক কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এসব সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় হয় জনগণের অর্থ। তাই এই সম্পদ রক্ষা করা প্রশাসনের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্বের অংশ, আর নিরাপদে চলাচল করা জনগণের ন্যায্য অধিকার।
১০০ পরিবারের রুটি-রুজি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ১৮ লাখ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও চলাচলের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে সিদ্ধান্তে এক পক্ষের জীবিকা রক্ষার নামে অন্য পক্ষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা অবশ্যই কঠোরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। জনস্বার্থের প্রশ্নে কোনো গোষ্ঠীর দাবি চূড়ান্ত হতে পারে না; চূড়ান্ত হতে হবে আইন, প্রকৌশলগত বাস্তবতা এবং মানুষের নিরাপত্তা।
আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট দাবি জানাই- ওজন স্কেল স্থাপনের অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করুন, সড়কের ভারবহনক্ষমতা অনুযায়ী ড্রাম ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করুন, অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিন এবং সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনুন। পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করুন।
আর কত সড়ক নষ্ট হলে, আর কত মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হলে, আর কত পরিবার প্রিয়জন হারালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক রক্ষা এবং মানুষের জীবন বাঁচানো কি প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নয়?
১০০ পরিবারের জীবিকা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে ১৮ লাখ মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার অধিকার কারও নেই। লক্ষ্মীপুরের সড়ক বাঁচাতে হবে, মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। এখন প্রয়োজন আশ্বাস নয়- কার্যকর পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
মো: কামাল উদ্দিন হাওলাদার
সাবেক সভাপতি
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাব।
























