শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে উপাচার্য নিয়োগ, পাল্টাপাল্টি অবস্থান, প্রশাসনিক ভবনে তালা ভাঙা এবং প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার ঘটনা- কোনোটিই একটি সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্মানজনক নয়। সরকার কি সংকট সমাধান করতে চায়, নাকি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নামে সংকটকে আরও গভীর করছে?
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) দেশের একটি সুনামধন্য প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানচর্চায় প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষাহীন, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- এই অচলাবস্থার অবসান ঘটানোর দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা আসলে করছেন কী?
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন থেকেই সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি শুরু হয়। এর ফলে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।
প্রশ্ন হলো, চুয়েট যখন মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে চলছিল, তখন উপাচার্য পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? এই পরিবর্তনের পেছনে সরকারের বিবেচ্য বিষয়গুলো কী ছিল? বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার যৌক্তিকতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলের সামনে স্পষ্ট করা হলো না কেন? একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবর্তন কি কেবল নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেই সম্পন্ন করা যায়, নাকি এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষার পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আস্থার প্রশ্নও জড়িত?
অবশ্যই উপাচার্য নিয়োগ সরকারের আইনগত ক্ষমতার বিষয়। শিক্ষার্থীদের আপত্তি থাকলেই যে সরকারের নিয়োগ অবৈধ হয়ে যাবে, এমন নয়। কিন্তু আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করা আর সেই ক্ষমতার যথার্থতা প্রমাণ করা এক কথা নয়। সরকার যদি মনে করে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমই এই দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি, তাহলে তাঁর নিয়োগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তুলে ধরতে হবে। প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শুধু নিয়োগের বৈধতা দেখিয়ে বিরোধিতা থামানোর চেষ্টা কি সংকট নিরসনের সঠিক পথ?
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সূত্রপাত শুধু নতুন উপাচার্যের নিয়োগকে কেন্দ্র করে নয়; বরং বেতন আটকে দেওয়া, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হুমকি এবং প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে প্রবেশের মতো অভিযোগও তাঁদের ক্ষোভের কারণ। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও তথ্য-প্রমাণ দিয়ে স্পষ্ট করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি সংকট তৈরি হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর মধ্যস্থতা করতে পারল না কেন? দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর পথ তৈরি করা গেল না কেন? শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে আস্থার সংকট আরও বাড়বে না কি?
একজন উপাচার্যকে নিয়োগ দেওয়া সরকারের অধিকার হতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার দায় কে নেবে? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কি কোনো প্রশাসন, সরকার কিংবা আন্দোলনকারী পক্ষের আছে?
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, গত সোমবার উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাত্রদল নেতাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে যান- বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে এমন তথ্য এসেছে।
একজন উপাচার্য কি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন? তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা কি এতটাই দুর্বল যে দায়িত্ব পালনের জন্য রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের উপস্থিতি প্রয়োজন? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শন কি পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতমুখী করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করে না?
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়। এটি জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর মতবিনিময়ের জায়গা। এখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হওয়া উচিত আইন, নিয়ম, সংলাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ভিত্তিতে। কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে তা শিক্ষাঙ্গনের নিরপেক্ষতা ও মর্যাদার জন্য অশনিসংকেত।
একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট করা দরকার, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে; কিন্তু প্রতিবাদের নামে কাউকে জিম্মি করে রাখা, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত করা কিংবা স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। নিয়ম সবার জন্য সমান হতে হবে। উপাচার্য যেমন আইনের ঊর্ধ্বে নন, তেমনি শিক্ষার্থীরাও আইন ও ন্যায্যতার ঊর্ধ্বে নন।
প্রায় ৩০ ঘণ্টা প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ থাকার পর ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের উদ্যোগে উপাচার্যকে বের করে আনা হয়। সংবাদ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস থেকে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা শর্ত দেন, তিনি আর ক্যাম্পাসে আসবেন না।
এই ঘটনা কি চুয়েটের প্রশাসনিক ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার প্রকাশ নয়? একজন সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে দায়িত্ব পালন করতে এসে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকতে হবে কেন? তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান করা প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল না কি?
আবার প্রশ্ন উঠবে, উপাচার্য যদি জানতেন যে তাঁর নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে, তাহলে সংলাপের কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশের পথ বেছে নেওয়া কতটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ছিল? পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এমন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের দায়িত্ব শুধু দাপ্তরিক চেয়ারে বসা নয়; বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থা অর্জন করা। আর সেই আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন সংযম, সংলাপ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব।
সব বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলে তার ক্ষতি শুধু একটি সেমিস্টার বা শিক্ষাবর্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে গবেষণা, স্নাতক সম্পন্ন করার সময়, কর্মজীবনে প্রবেশ এবং সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও। এসব ক্ষতির দায় কে নেবে?
শিক্ষার্থীরা যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ থেকে আন্দোলনে নেমেছেন, তা শুনতে হবে। কিন্তু সেই আন্দোলন এমন পর্যায়ে যেতে পারে না, যেখানে আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের আগেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়ে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও অনমনীয় অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানাতে পারে না।
সরকারের উচিত অবিলম্বে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কার্যকর সংলাপের ব্যবস্থা করা। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর রূপরেখা তৈরি করতে হবে। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতনসংক্রান্ত অভিযোগ, হুমকির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা ভাঙার ঘটনাসহ সব বিতর্কিত বিষয় নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে উপাচার্য ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে হবে।
সরকারকেও ব্যাখ্যা করতে হবে, আগের উপাচার্যকে অপসারণের ভিত্তি কী ছিল এবং নতুন উপাচার্য নিয়োগের পেছনে কী বিবেচনা কাজ করেছে। সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারলে অযৌক্তিক সন্দেহ ও বিভ্রান্তি কমবে। আর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে উভয় পক্ষই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
চুয়েটকে অচল রেখে কার লাভ হচ্ছে? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে কোন দাবি পূরণ হবে? আর একটি সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে কার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই খুঁজতে হবে। কারণ, কোনো উপাচার্য, কোনো সরকার কিংবা কোনো আন্দোলনই চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের চেয়ে বড় হতে পারে না।
লেখক,
মোঃ কামাল উদ্দিন হাওলাদার
সাবেক সভাপতি
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাব।