
স্টাফ রিপোর্টার : নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অমান্য করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিক্রিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে লক্ষ্মীপুরে টানা দুই দিনের পৃথক অভিযানে পাঁচটি খাদ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর পরিচালিত এসব অভিযানে তিনটি রেস্তোরাঁ, একটি মিষ্টির দোকান ও একটি দেশি-বিদেশি খাদ্যপণ্যের ডিলার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
অভিযানে রেস্তোরাঁগুলোর রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে অবহেলা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ কেওড়া জল ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে মিষ্টির দোকানে নোংরা ও ময়লাযুক্ত বাসি শিরা, খোলা অবস্থায় মিষ্টি রাখা এবং মেয়াদ উল্লেখ না করে মিষ্টি ও দই বিক্রির জন্য প্রদর্শনের মতো অনিয়ম ধরা পড়ে।
এ ছাড়া একটি খাদ্যপণ্যের ডিলার প্রতিষ্ঠানের গোডাউনে আমদানিকারকের পূর্ণ তথ্য ও যথাযথ লেবেলবিহীন বিপুল পরিমাণ বিদেশি খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন আমদানিকারকের লেবেল গোডাউনে বসেই পণ্যের গায়ে লাগানোর প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর শহরের নূরজাহান, মোহাম্মদীয়া ও রাজমহল রেস্টুরেন্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অমান্যের দায়ে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে তিন প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর মধ্যে নূরজাহান রেস্টুরেন্টকে ৫ লাখ টাকা এবং মোহাম্মদীয়া রেস্টুরেন্টকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং রাজমহলকে ৪ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযানে প্রতিষ্ঠানগুলোর রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অবহেলা ও অসতর্কতার সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ, ফ্রিজে কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে রাখা, নিষিদ্ধ কেওড়া জল ব্যবহার এবং রান্নাঘরে পরিধেয় কাপড় রাখাসহ বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এর পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্মীপুর শহরের ঝুমুর এলাকার বিসমিল্লাহ মিষ্টি বাজার এবং উত্তর তেমুহনী সংলগ্ন কালীবাজার রোডের দেশি-বিদেশি খাদ্যপণ্যের ডিলার মেসার্স ইভা ট্রেডার্সে অভিযান চালানো হয়।
এদিন সামারি ট্রায়ালে বিসমিল্লাহ মিষ্টি বাজারকে ১ লাখ টাকা এবং মেসার্স ইভা ট্রেডার্সকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ফলে দুই দিনের অভিযানে সর্বমোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
১৯ সেপ্টেম্বর বিসমিল্লাহ মিষ্টি বাজারে অভিযান চালিয়ে নোংরা ও ময়লাযুক্ত বাসি মিষ্টির শিরা পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি খোলা অবস্থায় রাখা ছিল। মেয়াদ উল্লেখ না করে বিক্রির উদ্দেশ্যে শেল্ফে মিষ্টি ও দই প্রদর্শন করা হচ্ছিল।
অভিযানের সময় খাদ্য ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মেমো, রশিদ ও চালানসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও মালিকপক্ষ যথাযথভাবে প্রদর্শন করতে পারেনি বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এসব অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে নিরাপদ খাদ্য আইনে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অন্যদিকে উত্তর তেমুহনী সংলগ্ন কালীবাজার রোডের মেসার্স ইভা ট্রেডার্সের গোডাউনে অভিযান চালিয়ে আমদানিকারকের পূর্ণ তথ্যবিহীন ও যথাযথ লেবেলিং ছাড়া বিপুল পরিমাণ বিদেশি খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়।
অভিযানে প্রিঙ্গলস, ক্যাডবেরি, টুনা ফিশের ক্যানসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়। এসব পণ্যের অনেকগুলোর গায়ে আমদানিকারকের প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল না বলে জানানো হয়।
অভিযানসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গোডাউনে বিভিন্ন আমদানিকারকের লেবেল পাওয়া গেছে। এসব লেবেল গোডামেই খাদ্যপণ্যের গায়ে লাগানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে পণ্যের প্রকৃত আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
এসব অনিয়মের দায়ে মেসার্স ইভা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. এমরানকে নিরাপদ খাদ্য আইনের ৩২ ধারায় ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বরের উভয় দিনের অভিযানে নেতৃত্ব দেন বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত লক্ষ্মীপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ওমর ফারুক। অভিযানে সার্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা সুমধু চক্রবর্তী।
অভিযানের সময় সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল এসআরবি-১১ ও বাংলাদেশ পুলিশের একটি চৌকস দল। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মো. তাজুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক আবদুল্লাহ হিল হাকিম এবং এনএসআইয়ের প্রতিনিধিরা।
অভিযান শেষে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ওমর ফারুক খাদ্য ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করে নিজ নিজ খাদ্যস্থাপনার পরিবেশ উন্নত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা সুমধু চক্রবর্তী বলেন, নিরাপদ খাদ্য জনগণের অধিকার। খাদ্য ব্যবসায়ীদের যথাযথ নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের ও ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও সামারি ট্রায়াল জনস্বার্থে ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, লেবেলিং ও বিক্রি- প্রতিটি ধাপেই আইন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রি, মেয়াদবিহীন পণ্য বাজারজাত এবং আমদানিকারকের তথ্য গোপন করে খাদ্যপণ্য বিক্রির মতো অনিয়ম ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে নিয়মিত তদারকি ও আইনের প্রয়োগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
























